অবৈধভাবে আটক ৪কিশোরী উদ্ধার,অপহরণ চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ্তার,ফোন ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার
দ্বীন মোহাম্মদ মজুমদার / মো: মাসুদ
ফেনীর সোনাগাজী ও ফেনী পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে আটক ৪ কিশোরীকে উদ্ধার এবং অপহরণ, প্রতারণা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় অভিযুক্তদের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালংকার উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে ফেনী মডেল থানা পুলিশ ।
পুলিশের দেওয়া তথ্য ও মামলার নথি অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে সোনাগাজী থানাধীন এলাকার কিশোরী সাইমা আক্তার সালমা (১৪) মাদ্রাসার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর সে আর বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কোথাও তার সন্ধান না পেয়ে ২১ আগস্ট সোনাগাজী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
জিডির সূত্র ধরে পুলিশ তদন্ত শুরু করলে ফেনী শহরের পৌরসভা এলাকার মধ্যম চাঁদপুরের একটি বাড়িতে সন্দেহজনকভাবে কয়েকজনের অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে ওই বাড়ির ভাড়াটিয়াদের গতিবিধি সন্দেহজনক বলে পুলিশকে অবহিত করা হয়। পরে ফেনী মডেল থানার পুলিশ সদস্যরা সেখানে অভিযান পরিচালনা করেন।
অভিযানের সময় পুলিশ সাইমা আক্তার সালমাসহ আরও কয়েকজন কিশোরীকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া কিশোরীদের মধ্যে সাইমা আক্তার সালমা (১৪), ইশমত জাহান প্রমি (১৪), ভান্নাহার আক্তার সুমাইয়া (১৫) এবং রাবিয়া সুলতানা রাণী (১৫) রয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সবার বাড়ি ফেনী জেলার বিভিন্ন এলাকায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া কিশোরীদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে, তারা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ও প্রতারণার মাধ্যমে ওই বাসায় নিয়ে যাওয়ার শিকার হয়েছেন। অভিযুক্তরা কখনো চাকরি, কখনো বাসা ভাড়া কিংবা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা বলে তাদের আস্থায় নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার আরও চাঞ্চল্যকর দিক বেরিয়ে আসে পরবর্তী তদন্তে। পুলিশ জানায়, ২০ আগস্ট বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে মোবারক হোসেন শাওক (১৮) নামে এক যুবকসহ কয়েকজন ওই বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তাদের কথাবার্তা ও আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় পুলিশ বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখে।
অভিযোগ রয়েছে, চক্রটির সদস্যরা কিশোরীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন। কেউ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি তাদের সহযোগী কয়েকজনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ ও প্রলোভনের চেষ্টা করা হতো বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, চক্রটির সদস্যরা কিশোরীদের কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এ সময় একটি মোবাইল ফোনের মূল্য প্রায় এক লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া একটি কিশোরীর ব্যবহৃত স্বর্ণের কানের দুল নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়।
পুলিশের অভিযানে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া কিশোরীদের নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করে পুলিশ।
এ ঘটনায় সাইমা আক্তার সালমার মা সাজেদা আক্তার থানায় উপস্থিত হয়ে উদ্ধার হওয়া কিশোরীদেরসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফেনী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় অপহরণ, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার পর পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া মোবারক হোসেন শাওক (১৮) নামে আরও একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে একটি মোবাইল ফোন ও এক জোড়া কানের দুল।
মডেল থানার ওসি তদন্ত সজল কান্তি দাস বলছে, ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া কিশোরীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং মামলার এজাহারে উল্লেখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চক্রটির সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ দলের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ফেনী মডেল থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কিশোরী উদ্ধার ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে।
পুলিশের এ অভিযানে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের নিরাপত্তা এবং অপরিচিত ব্যক্তিদের প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকার বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিভিন্ন প্রলোভনের মাধ্যমে কিশোরীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বিপথে নেওয়ার চেষ্টা হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

