অন্যান্যক্যাম্পাসজাতীয়প্রচ্ছদরাজনীতিসর্বশেষসারাদেশ

সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ক্লান্ত: সরকারের করণীয় কী ?

নূর মোহাম্মদ পাটোয়ারী

আমাদের অন্তর্বতী সরকার কোনো অংশে দুর্বল নয় । জলের, স্থলের ও আকাশ বাহিনী তাঁর সহযোগী। প্রশাসনের সর্বস্তরের লোক তাঁর অনুগত। রাজনৈতিক দলের সকল নেতৃবৃন্দ তাঁর শুভাকাঙ্খী। বিশে^র সকল রাষ্টপ্রধান তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাই বাংলাদেশকে একটা আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা তাঁরই পক্ষে সম্ভব। সরকার যদি নিজেকে দুর্বল মনে করে হাল ছেড়ে দেয়, নির্যাতিত মানুষের উপায় কি?
মাননীয় উপদেষ্টা ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ভেঙে পড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থ্্া এক বছরে ঠিক করা সম্ভব নয়। এ দুর্বল কথাটা নির্বাচিত সরকার বলতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার এতো দুর্বল নয়। আমাদের মাননীয় বর্তমান সরকার মাত্র একটি বাক্য প্রয়োগ করলে, গোটা দেশ ঠিক করতে সময় লাগবে মাত্র এক দিন। আমাদের দেশের প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা, কোর্ট কাচারী, জজ, হাকীম, নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনী, আর্মি সহ প্রশাসনের সর্বস্তরের লোক দেশের সন্ত্রাসী কর্মকা- দূর করতে প্রস্তুত। তথাপিও দূর করতে পারেনা কেন? পত্রিকা খুললেই দেখা যায়, গুম, খুন, ধর্ষণ আর শিশু হত্যা। দুইজন শিশু খেলতে গিয়ে আর মায়ের কোলে ফিরে আসেনি। অপহরণকারীদের নিকট থেকে দফায়-দফায় মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছে। সন্তানকে জীবিত পাওয়ার আশায়, মুক্তিপণ দেয়ার পরও সন্তানদ্বয়কে এক ডোবার মধ্যে লাশ পাওয়া গেল। এভাবে কত যে শিশু অপহরণ হচ্ছে। তারপরও তারা প্রশাসনের জালে ধরা পড়ে না কেন?
বিগত ২৭/০৭/২৫ ইং ইনকিলাব পত্রিকায় দেখলাম, এই তিন মাসে ২০৮ জন নারী শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তন্মধ্যে ১০৯ জন কণ্যাশিশু। ১৩ জন কণ্যাশিশু দলবদ্বভাবে ধর্ষণের শিকার। ৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এভাবে নির্যাতিতদের আত্মচিৎকার, সন্তানহারা মায়েদের বুকফাটা কান্না, সরকারের কর্ণগোচর হবে কবে? দেশে একটা বিশেষ কোন অঘটন ঘটলে, প্রশাসন নড়ে-চড়ে বসে। যেমন- আইনজীবী আলিক হত্যা, ঢাকায় ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যা, শুধু হত্যা নয়, হত্যার পর উল্লাস করা। মূলতঃ তারা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করেছে। কোনো কুকুরকেও মানুষ এভাবে হত্যা করে না।
এদিকে শিশু আছিয়া’কে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে। দেশের জনগণ আশা করেছিল তাদেরকে বিশেষ ট্রাইবুনালে দ্রুত বিচার করা হবে। দেখা গেল প্রশাসন যত গর্জে তত বর্ষে না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামী ধরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মামলার রায় ঘোষণা করে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আসামীদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হলে, তখন থেকেই দেশ শান্ত হয়ে যেত। দেশের মানুষ আজ সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকা লাগতো না।
স্কুল মাদ্রাসার শিশুদেরকে গুম করে হত্যা করা। নাইট কোর্সে ডাকাতি ও নারীদের শ্লীলতাহানী করা, রাস্তায় গাছ ফেলে পথ রুদ্ধ করে ডাকাতি করা, রাস্তায় চলার পথে স্বামীকে গাছের সাথে বেঁধে রেখে, স্ত্রীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা, গ্রীল কেটে ঘরে ঢুকে গৃহকর্তাকে মেরে মালামাল নিয়ে যাওয়া, একের পর এক মসজিদের ইমাম হত্যা করা, বিভিন্ন স্থানে বস্তাবন্দি লাশ পাওয়া, কথায় কথায় একে অপরকে খুন করা, বর্তমানে দেশটা যেন একটা মগের মল্লুকে পরিণত হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে নির্বাচন বা নির্বাচনোত্তর যদি আরো লোক ক্ষয় হয়, এ জন্য দায়ভার বহন করবে কে? চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, অপহরণ যদি বন্ধ করা সম্ভব না হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজন কি? একটা ঘটনা ঘটলেই পুলিশ গিয়ে কিছু লোককে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। এ গতাণুগতিক তরিকা নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ বর্তমানে মানুষ গ্রেফতারকে ভয় করে না। হাজার হাজার আসামী স্বেচ্ছায় গ্রেফতার হচ্ছে। স্বামী, স্ত্রীকে খুন করে থানায় খবর দেয় আমাকে গ্রেফতার করুন, আমি আমার স্ত্রীকে খুন করেছি। আবার কোথাও স্ত্রী, স্বামীকে খুন করে থানায় ফোন করে বলে আমি আমার স্বামীকে খুন করেছি, আমাকে থানায় নিয়ে যান। তারা জানে মানুষ খুন করেও কোন রকমে থানায় উঠতে পারলে নিরাপদ। সেখান থেকে কারাগারে কয়দিন থাকার পর আইনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে বের হয়ে যাবে, বর্তমানে হচ্ছেও তাই।
এ জন্য গ্রেফতার হওয়াকে মানুষ ভয় করে না। বর্তমান প্রচলিত (ইংরেজদের তৈরি) আইনে মানুষের নিরাপত্তা নেই। আছে কুকুরের নিরাপত্তা, কুকুরের নির্যাতন সর্ম্পকে ছবিসহ জাতীয় পত্রিকায় বার বার দেয়া হলেও, সরকার কুকুর সম্পর্কে কোন প্রকার ঘোষণা দিতে সাহস করেনি। পূর্বে বেওয়ারিশ কুকুর মারার বিধান ছিল। শেখ হাসিনার আমল থেকে তা বাতিল হয়ে যায়, ফলে কুকুরের পরিমাণ এতো বৃদ্ধি হয়েছে, দিন রাত দলবদ্ধভাবে চলতে থাকে, যেন কুকুরের মিছিল বের হচ্ছে। যার কারণে কচি কাঁচা শিশুরা নিজ নিজ পাঠশালায় যাওয়া দুস্কর হয়ে পড়েছে। ইংরেজদের তৈরি আইন বাদ দিয়ে, মানুষের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে। ক্ষতিকরপ্রাণি মেরে ফেলা দোষ নয়, এ জন্য বেওয়ারিশ কুকুর মারার বিধান পুনরায় চালু করতে হবে।
আমাদের দেশে প্রচলিত আইন হচ্ছে সেই ইংরেজদের তৈরি। এ আইনের কারণে সন্ত্রাসীদের সঠিক বিচার হচ্ছে না, বরং আরো প্রশ্রয় পাচ্ছে। স্বঘোষিত খুনিও মৃত্যুদ- থেকে বেঁচে যাচ্ছে। নেশার টাকা না পাওয়ার কারণে সন্তান নিজের মাকে খুন করেও মৃত্যুদ- থেকে বেঁচে গেল। তাছাড়া এক একটা মামলার রায় হতে সময় লাগে প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর অথবা আরও বেশি। হাই কোর্ট বিভাগের বিচারপতি জনাব আহমেদ সোহেল বলেছেন, মামলাজট নিস্পত্তিতে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা পুরোপুরি সফল নয়। বাংলাদেশে বিচার বিভাগে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা জট লেগে আছে।

এ দেশের জনগণ সরকারের নিকট সার্বিক নিরাপত্তা চায়। এ জন্য সরকার মহোদয়কে অনুরোধ করতে চাই, দেশ প্রেমিক ও আদর্শবান ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করে দেশের মধ্যে গুম, খুন, ধর্ষণ, চুরি ও ডাকাতি, শিশু হত্যা বন্ধ করার ব্যাপারে দ্রুত একটা সমাধান বের করুন। যাতে মানুষ সার্বিক নিরাপত্তার সাথে চলাফেরা করতে পারে। এ ব্যাপারে আমার একটা ব্যক্তিগত পরামর্শ হলো: সরকার যদি এমন একটা ঘোষণা দেয়, এখন থেকে এদেশে যদি গুম, খুন, ধর্ষণ, শিশু হত্যা, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই এর মত একটি ঘটনাও ঘটে, তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামীকে ধরে এনে সাথে সাথে মৃত্যুদ- দেয়া হবে।
তবে গোটা দেশ অল্প সময়ের মধ্যে শান্ত হয়ে যাবে। ইরানে এ বছর ৮৪১ জনকে মৃত্যুদ- দিয়েছে। বাংলাদেশে মাত্র ৮ জনকে মৃত্যুদ- দেয়া হলেও, আশা করা যায় দেশে আর সন্ত্রাস থাকবে না।

অতএব, নির্বাচনের যে কয় মাস বাকি আছে, এর মধ্যে বর্তমান সরকার যদি কঠোরহস্তে সন্ত্রাসী কর্ম-কা- ও যাবতীয় দুর্নীতি বন্ধ করে মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারে, অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়টা মানুষের মনে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে।

ন্যায়বিচার পাওয়ার নিমিত্তে জনগণের পক্ষ থেকে কিছু সুপারিশ:

০১। গুম, খুন, ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মত জঘন্য অপরাধের আসামী হলে, তাদের ধর্ম, বর্ণ, দলীয় ও জাতীগত পরিচয় বাদ দিয়ে, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুদ- কার্যকর করা।
০২। মিথ্যা মামলা, ভুয়া চার্জশিট প্রদানকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা।
০৩। মিথ্যা মামলায় যারা এখনো কারাভোগ করতেছে, খোঁজ নিয়ে তাদেরকে দ্রুত মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা।
০৪। নির্যাতিত ও অসহায় ব্যক্তিদের পক্ষে সরকার বাদী হয়ে মামলা পরিচালনার ব্যাপারে আরো আন্তরিক হওয়া।
০৫। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মধ্যে কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় দায়িত্বে অবহেলা করে, অথবা কোনো সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবে প্রমাণ পাওয়া যায়, তাকে চাকুরীচ্যুত সহ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।
০৬। অধিক সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে উল্লেখযোগ্য সন্ত্রাসীদেরকে যারা গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে, তাদের পদোন্নতি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করা।
০৭। চাঞ্চল্যকর সন্ত্রাসী কর্ম-কা-ের বিচারের জন্য দেশপ্রেমিক জ্ঞানী ব্যক্তিদের সমন¦য়ে যুগোপযোগী আইন প্রণয়ণের ব্যবস্থা করা।
০৮। মামলার বিচারের দীর্ঘ সুত্রতা পরিহার করে, স্বল্পসময়ের মধ্যে রায় ঘোষণার ব্যবস্থা করা।
০৯। ইসলাম ধর্ম বা ইসলাম ধর্মের যে কোনো বিষয়কে নিয়ে যারা কটুক্তি করবে, তাদেরকে ধর্ম, বর্ণ, দল-গোত্র নির্বিশেষ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামী ধরে, সাথে সাথেই মুত্যুদ- দেয়ার বিধান চালু করা।
১০। দেশের অবস্থা যেহেতু দ্রুত অবণতির দিকে যাচ্ছে, সেহেতু নির্বাচনের তারিখ’কে আরো ত্বরাণি¦ত করে, নির্বাচিত সরকারের নিকট ক্ষমতা প্রদানের নিমিত্তে দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ সমাধা করা।

মাও. নূর মোহাম্মাদ পাটোয়ারী,সিনিয়র শিক্ষক (অব.),জগতপুর উচ্চ বিদ্যালয়,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *