পরশুরামে ৫৫স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মানববন্ধনে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের দাবি
পরশুরাম প্রতিনিধি
পরশুরামে মুহুরী,সিলোনিয়া ও কহুয়া নদীর টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবিতে উপজেলার ৫৬ টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগে মানববন্ধন করেছে। সেই সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ ৫ দফা দাবি জানিয়েছেন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা।
নতুন টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি বাঁধ সংরক্ষণ এবং খাল খননের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিতে ১৫ জুলাই (মঙ্গলবার) উপজেলা গেইটের সামনে আয়োজিত ও সম্মিলিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধি ইমাম হোসেন সজীবের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে পরশুরাম উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ছোট বড় ৫৬ টি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরাসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
ভয়াল বন্যায় প্রতিবছর পরশুরামের মুহুরী, সিলোনীয়া ও কহুয়া নদীর একাধিক স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে পরশুরাম, ফুলগাজী,ছাগলনাইয়া সহ সমগ্র ফেনীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে পরশুরাম সহ ফেনী অঞ্চলের মানুষের ঘরবাড়ি, ব্যবসা,মৎস্য ও কৃষিখাতে শত শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। বন্যা এলেই পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ত্রাণ বিতরণ করে ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে পরিদর্শনে আসেন ঠিকই কিন্তু টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে স্থায়ী কোন সমাধান করা হয় না। বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মহাদুর্নীতির কারণে টেকসই বাঁধ নির্মাণ হয় না।
এবারের বন্যায় ফেনীতে ৩৬টি স্থানে মুহুরী, সিলোনীয়া ও কহুয়া নদীর বাঁধ ভেঙ্গে ১১২টি গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ পানিপন্দি হয়ে পড়ে। ২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুসে ওঠে মানুষ। ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্যাপক দুর্নীতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির অভাবে ফেনীর মানুষের প্রাণের দাবি টেকসই বাঁধ নির্মাণের নামে বৃহৎ প্রকল্পের বরাদ্দকৃত শত-শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন সংক্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাই পরশুরামসহ ফেনী অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এই ৩টি নদীর টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদী খননের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও বিভিন্ন খাতে ক্ষয়ক্ষতির দুঃখ মুছে পরশুরাম সহ ফেনীর মানুষের স্বাভাবিক জনজীবনের আশায় সরকারের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত (একনেক)-এ পাস করে বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জোর দাবী জানান মানববন্ধনে অংশগ্রহণকৃত সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো।
পরশুরামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ফ্রেন্ডস ইউনিটি ব্লাড ডোনার ক্লাব, মিশন হেল্প ফাউন্ডেশন, পরশুরাম ইয়ুথ ফ্রেন্ডস ক্লাব, কুঁড়েরঘর ফাউন্ডেশন, রাহবার সহ উপজেলা তিনটির ইউনিয়নের ছোট বড় ৫৬টি সেচ্ছাসেবী সংগঠনের শত শত সদস্য ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সম্মেলিত অংশগ্রহণে ব্যানার,ফেস্টুন হাতে বিভিন্ন প্লেকার্ড নিয়ে তারা টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগানে উত্তাল করে তুলেন পরশুরাম বাজার। এসময় ৫৬টি সেচ্ছাসেবী সংগঠনের ২০টির অধিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক দলের নেতারা বন্যার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড,ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর অপসারণ ও অতীতে বাঁধ নির্মাণ কাজের দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত ঠিকাদারদের শাস্তি দাবী রেখে পরবর্তী বিভিন্ন দাবিদাওয়ার কথা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন।
এসময় বক্তব্য রাখেন – পশ্চিম অলকায় মূহুরী নদীর বেড়িবাঁধ ভাঙ্গনে ঘর হারা মাসুম চৌধুরী, পরশুরাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি এমএ হাসান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক শামসুল আলম শাকিল, মো মোস্তফা, কাজী ইউছুফ বাপ্পি, হাকিম আলী জয়, চৌধুরী রাকিব, এনামুল করিম আজাদ, মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের ভূঁঞা, মো নাঈম,মো ইউনুছ, শাহিদুল আফসার,আবদুল কাদের,আবু হানিফ হেলাল প্রমুখ।
বক্তারা পরশুরাম সহ ফেনী অঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের নামে যদি আর কোন নয়-ছয় কেউ করার চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার হুশিয়ার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেনী প্রকৌশলীর দ্রুত অপসারণ ও শাস্তি দাবী করেন। এবং বাঁধ নির্মাণের নতুন প্রকল্পের কাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
এছাড়াও মানববন্ধনে সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ৫টি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো ছিলো ১)সরকারের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত ‘একনেকে’ পাস করে বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দিতে হবে
২)ফেনী জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে অপসারণ ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে
৩) প্রতি মাসে পানি উন্নয়ন বোর্ডের গণশুনানিতে আপামর জনতা, সাধারণ মানুষকে ও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের রাখতে হবে।
৪) নতুন টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি বাঁধ সংরক্ষণ এবং খাল খননের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে
৫)। এবারের বন্যার জন্য দায়ী বাঁধ সংশ্লিষ্ট ও ঠিকাদারকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে
উল্লেখ্য, গত ২৪ সালের আগষ্টের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীতে ১৯জন মানুষ মারা যায়। মৎস্য,কৃষি,ব্যবসা সহ বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় ফেনীর মানুষ। ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে যায়। রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্টে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কবলে পড়ে ফেনী। সেই ক্ষত না শুকাতেই আবারও বন্যায় নাকাল পরশুরাম সহ ফেনী জেলা। ২৫-এ বন্যায় মানুষ মারা না গেলেও এর ভয়াবহতা যেন আরও দূর্বিসহ। অনেকে হারিয়েছে মাথা গুছার টাই, হারিয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

