Uncategorizedঅন্যান্যঅর্থনীতিআন্তর্জাতিকক্যাম্পাসজাতীয়প্রচ্ছদফিচাররাজনীতিসর্বশেষসারাদেশ

জাইমা রহমান রাজনীতির মঞ্চে, উত্থানের নেপথ্যে কী ?

বিশেষ প্রতিনিধি

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হলেও বর্তমানে তার চেয়েও বেশি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তার কন্যা জাইমা রহমান। দলের কোনো আনুষ্ঠানিক পদ না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে তার সক্রিয় উপস্থিতি ও ভূমিকা নতুন করে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কি কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা, নাকি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে বিএনপির একটি সুপরিকল্পিত ‘মাস্টার প্ল্যান’—তা নিয়েই চলছে আলোচনা।

২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে পাড়ি জমান তারেক রহমান। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরেন।

দেশে ফেরার পরপরই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায় জাইমা রহমানের কর্মকাণ্ডে। তাকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়। দীর্ঘদিন লন্ডনের নিভৃত জীবন কাটিয়ে সরাসরি ঢাকার রাজপথের রাজনীতিতে তার উপস্থিতিকে নিছক পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনী জাইমা রহমানের জন্ম ১৯৯৫ সালে ঢাকায়। তিনি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা শুরু করলেও তার বেড়ে ওঠা লন্ডনে। সেখানে মেরিমাউন্ট গার্লস স্কুলে পড়াশোনা শেষে কুইন মেরি ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ইনার টেম্পল থেকে ব্যারিস্টারি ডিগ্রি অর্জন করেন।

গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার ঠিক দুই দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের আইন পেশার প্রতি আগ্রহের কথা প্রকাশ করেন জাইমা রহমান। এর মাধ্যমে তিনি তার আধুনিক ও পেশাদার ভাবমূর্তির ইঙ্গিত দেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দেশে ফেরার আগেই তিনি নেপথ্যে থেকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসে অবস্থান করেও জনমত গঠনে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন।

দেশে ফেরার পর ১৮ জানুয়ারি ‘উইমেন শেপিং দ্য নেশন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তার প্রথম বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। ওই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, বাবা তারেক রহমানকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে তিনি সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছেন।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে তারেক রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে জাইমা রহমানের অংশগ্রহণ বিএনপির আন্তর্জাতিক কৌশলের দিকটি তুলে ধরে। এতে প্রমাণিত হয়, দলটি তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র নতুন কিছু নয়। বিএনপির তৃণমূল সমর্থকেরা এই পরিবারকে কেন্দ্র করেই ঐক্যবদ্ধ। তাই জাইমা রহমানকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করা মূলত দলের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিনিয়োগ।

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, ২০২৪ সালের বিপ্লবোত্তর প্রেক্ষাপটে জেন-জি বা তরুণ ভোটারদের মন জয় করতেই তাকে সামনে আনা হয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মুজিবুর রহমান মনে করেন, জাইমা রহমানকে সামনে এনে বিএনপি মূলত জামায়াতে ইসলামীর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিপরীতে নিজেদের একটি প্রগতিশীল ও নারীবান্ধব ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চাইছে।

তার মতে, পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত একজন তরুণী ব্যারিস্টারকে সামনে রেখে বিএনপি একদিকে যেমন আধুনিক ভোটারদের আকৃষ্ট করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের উদারপন্থী অবস্থানও স্পষ্ট করছে।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বড় প্রশ্ন—জাইমা রহমান কি ভবিষ্যতে বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছেন, নাকি তিনি কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার হিসেবে ধীরে ধীরে রাজনীতিতে প্রস্তুত হচ্ছেন—তা সময়ই বলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *