প্রথিতযশা সাংবাদিক রতন ভাইয়ের জীবন অবসান
বিশেষ প্রতিনিধি
ফেনীর প্রথিতযশা সাংবাদিক শাহজালাল রতন ২৫ জানুয়ারি রাত ৮ ঘটিকার সময় কুমিল্লা ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহে রাজেউন)। ২৬ জানুয়ারি সকালে ফেনীর রামপুর পাটোয়ারি বাড়ি মসজিদ ও প্রেসক্লাবের সামনে পৃথক জানাজা শেষে চৌদ্দগ্রামের শিলুরি গ্রামে লাশ পাঠানো হয়। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭০ বছর।
সাংবাদিক রতনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ফেনী পৌর সভার মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজি, ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারবেজ হাজারী, ফেনী সাংবাদিক ইউনিয়ন, ফেনী প্রেসক্লাব, ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটি।
জানাযায়, ১৯৫৪ সালে কুমিল্লার বাগিচাঁগায়ে শাহজালালের জন্ম হয়। যদিও তাঁর স্থায়ীনিবাস কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শিলরী গ্রামে। পিতা এডভোকেট আবদুল মজিদ চৌধুরী কুমিল্লা কোর্টের পিপি ছিলেন। মাতা সুফিয়া খাতুন ছিলেন গৃহীনি। ৪ ভাই ৭ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
শাহজালাল রতনের শিক্ষা জীবন শুরু হয় কুমিল্লা রানীগঞ্জের মর্ডান স্কুল থেকে। ১৯৭০ সালে কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে এসএসসি ও ভিক্টোরিয়া থেকে ১৯৭৩ সালে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালিন দৈনিক জনপদে লেখালেখির শুরু করেন। ১৯৮৪ সালে দৈনিক বাংলার ফেনী প্রতিনিধি হিসাবে সাংবাদিকতা পেশা শুরু করেন। দৈনিক বাংলা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ঐ পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। দৈনিক বাংলা বন্ধ হওয়ার পর তিনি শফিক রেহমানের যায়যায় দিনে কিছু দিন কাজ করেন।
এরপর ১৯৯৮ সালে গোলাম সরওয়ার ইত্তেফাক ছেড়ে যুগান্তর পত্রিকা বের করলে যুগান্তরে স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে নিয়োগ পান। ২০০৫ সালে গোলাম সরওয়ার যুগান্তর ছেড়ে দৈনিক সমকাল পত্রিকা বের করলে তিনিও সমকালে স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে নিয়োগ পান এবং ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে সেচ্ছায় সমকাল পত্রিকা থেকে অবসর নেন।
শাহজালাল রতন দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও শ্বাসরোগে ভুগছিলেন। তিনি বছর ২০১৩ সালে ভারতের চেন্নাইতে গিয়ে কিডনী চিকিৎনা নেন। পুরোপুরি সুস্থ হননি।
জেলা শহরে সাংবাদিকতা করলেও তিনি ছিলেন ঢাকার রিপোর্টারদের মত অগ্রগামী সাংবাদিক। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ৫টি বইও লিখেন। এরমধ্যে অম্লমধুর, পথে যেতে যেতে অন্যতম।
পত্রিকার প্রতি তাঁর একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা, নিরপেক্ষতা ছিল। সাবেক এমপি জয়নাল হাজারী, জয়নাল আবেদিন ভিপি, জাফর ইমামের আমলে ফেনীর রাজনীতির নানা ত্রুটি বিচ্যুতি নিয়ে রিপোর্ট করলেও তিনি কোন সময় রোষানলে পড়েননি। তিনি ফেনী থেকে অনেকগুলো অনুসন্ধানী ও আলোচিত রিপোর্ট করেছিলেন। যা গুরুত্বের সাথে যুগান্তর ও সমকালের মত পত্রিকায় লীড নিউজ হয়েছে। এর মধ্যে ২০০১সালে হাজারীর বাড়িতে যেদিন(১৭আগস্ট) যৌথ অভিযান হয়, তার পরদিন যুগান্তরের প্রথম পৃষ্ঠাটা শাহজালাল রতনের লেখায় পরিপূর্ণ একটি সংখ্যা ছিল। ছবি আর সাইড স্টোরিসহ সেদিন ৮টি নিউজ ছাপা হয়েছিল তাঁর। তাঁর আরেকটি আলোচিত রিপোর্ট ছিল একরাম হত্যার পর ভুলে ভরা চার্জশিট। এই রিপোর্টটি সমকালে ছাপা হওয়ার পরদিন ঢাকার ৭টি পত্রিকায় এই রিপোর্টের বরাতে সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল।
সাংবাদিকতা শুধু তাঁর পেশা ছিল না , তিনি এটিকে নেশায় পরিনত করেন। তিনি ছিলেন নির্ভীকও সাহসী সাংবাদিক। কোথাও কোন ঘটনা ঘটলে তিনি তাঁর ১০০ সিসি হিরো হোন্ডা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন শহরে । ১৯৮২ সাল থেকে ৯০ এর দশকের শেষ পর্যন্ত তিনি এই হিরো হোণ্ডাটি চালাতেন। তিনি ফেনী প্রেস ক্লাব ও ফেনী বিপোর্টার ইউনিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
তিনি ছিলেন রামপুরের এক সময়ের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও পৌর চেয়ারম্যান আবু বক্কর এর একমাত্র মেয়ের জামাতা। ১৯৮৪ সালে দৈনিক বাংলার ফেনী প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে তিনি ফেনীর রামপুরে থিতু হন এবং এক সময় রামপুরে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী , দুই ছেলে ও এক মেয়ে, ছেলে বউ ও নাতি – নাতনি রেখে গেছেন।
শাহজালার রতন ছিলেন একজন পরোপাকারী ও নিরঙ্কারী ও পড়ালেখা জানা লোক। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আমিন।

